শাফিউল কায়েস


জন্ম থেকেই পোড়া কপাল। প্রথম থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে একজন মাত্র অধ্যাপক (স্থায়ী)। নাম ড. শাহজাহান।

তিনি আবার বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত)। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকশনস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইটিই) বিভাগের সভাপতি ছিলেন। এর আগে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. খোন্দকার মোঃ নাসিরউদ্দিনকে ভাইস-চ্যান্সেলর হিসেবে ৪ বছরের জন্য নিয়োগ প্রদান করে। কিন্তু ২০১৯ সালে ডঃ নাসিরুদ্দীনের বিপক্ষে নারী কেলেঙ্কারী, ক্ষমতার অপব্যবহার সহ নানাবিধ অভিযোগের প্রেক্ষিতে ছাত্রছাত্রীদের দুর্বার আন্দোলনের কারণে অপসারণ করা হয়।

উপাচার্য পদ থেকে বিগত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিনের পদত্যাগ করেন। তখন থেকে অধ্যাপক ড. শাহজাহান, ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

এখন সেখানে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য এবং ট্রেজারার; চ্যান্সেলর নিয়োগ দেবেন এমন তিনটি পদই শূন্য রয়েছে।

সেখানে তিনটি ইনস্টিটিউটের মধ্যে দুটি ইনস্টিটিউটেরই গভর্নিং বডি নেই। একটি বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক অনুমোদনই নেই। ২৯টি বিভাগে নেই অধ্যাপক। আর তিনটি বিভাগ এবং একটি ইনস্টিটিউটের নেই নিজস্ব কোনো শিক্ষক। গেস্ট টিচারের মাধ্যমেই চলছে এসকল বিভাগ ও ইনিস্টিউটের শিক্ষা কার্যক্রম।

চলুন বিশ্ববিদ্যালয়টি নিয়ে একটি গান শুনে আসি..

এসবের বাইরে ঘাটতি রয়েছে ক্লাসরুম, ল্যাবরুম এবং আবাসনের ক্ষেত্রেও৷ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ৩৪টি বিভাগের মধ্যে অন্তত ২০টি বিভাগের ক্লাসরুম সংকট রয়েছে এবং ১০টি বিভাগের ল্যাব সংকট রয়েছে।

আমার জানামতে, এই পৃথিবীতে একটি মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় আছে! যার পরিচিতি দুর্নীতি, অনিয়ম, নারী কেলেঙ্কারী দিয়ে। ভুল বললাম মনে হয়? না, কথাটি অপ্রিয় হলেও সত্য। তবে হ্যাঁ, একটা স্বস্তির খবরও আছে শিক্ষার্থীর সংখ্যার ওপর জরিপে দেশের চতুর্থ বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় এটি। সেই সাথে অন্যতম প্রধান উদ্ভিদ সংগ্রহশালা এটি। এই দুটি বিষয় নিয়ে কিছু সংবাদকর্মী লেখালেখিও করেছেন। তবে প্রচারণার অভাবে দেশবাসী এই ভালো বিষয়গুলো দিকে নজর না দিলেও ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা প্রায় সবাই জানে। তবে সাবেক উপাচার্যের দুর্নীতি-অনিয়মের কথা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিদ্যুৎ গতিতে দেশের মানুষের কাছে পরিচিতি পায় বিশ্ববিদ্যালয়টি। অবশেষে সেই উপাচার্য তার নিজের চেয়ারটি ধরে রাখতে পারেনি।

এতো দীর্ঘ কথাগুলো হল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ এর গেল বছরের আলোচিত বিষয়বস্তু। বিশ্ববিদ্যালয়টির সংক্ষিপ্ত নাম বশেমুরবিপ্রবি। আর পূর্বের কপাল পোড়া ইতিহাস সবাই জানেন।

এবার আসি মূল বিষয়ে। ২০০১ সালে জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০১ পাসের মাধ্যমে গোপালগঞ্জে যাত্রা শুরু করে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে অধ্যয়নরত রয়েছে প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থী। কিন্তু সম্প্রতি এই একই নামে পিরোজপুরেও একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা করছেন শিক্ষার্থী-শিক্ষকরা। তাঁরা ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেছে। সেই সঙ্গে সাবেক শিক্ষার্থীসহ, বশেমুরবিপ্রবিতে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের দাবি বশেমুরবিপ্রবি নামে আর কোন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত না হোক।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘বশেমুরবিপ্রবি আমার পরিচয়, এক নামে দুই বিশ্ববিদ্যালয় নয়‘ গ্রুপ খুলে এই বিষয়টি প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

এক শিক্ষার্থী এই গ্রুপে স্ট্যাটাস দেন– ‘জাতির পিতাকে নিয়ে এসকল মজা বন্ধ করুন’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, এক নামে দুই বিশ্ববিদ্যালয় মানি না মানবো না।”

আরেক শিক্ষার্থী আন্দোলন গড়ে তোলা হবে জানিয়ে এই গ্রুপে স্ট্যাটাস দিয়েছেন- “দেশে নামের কি অভাব পড়েছে? যে একই নামে দুইটি বিশ্ববিদ্যালয় দিতে হবে? নাকি নামের জনপ্রিয়তা?

যদি তাই হয় তাহলে দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পুনরায় “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়” করা হোক। এমন চিন্তা কিভাবে মাথায় আসে বুঝিনা।

-আমি বশেমুরবিপ্রবিয়ান হয়ে এটা কখনোই মানিনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব ও আমাদের পরিচিতি রক্ষায় প্রয়োজন হলে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।”

এভাবেই প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, বশেমুরবিপ্রবির সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

আমিও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে বলতে চাই- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় একটি হবে, দুটি নয়। এক বশেমুরবিপ্রবি মেরুদন্ডহীন অবস্থায় দেখার কেউ নেই, আরেক বশেমুরবিপ্রবির জন্ম দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নামকে তুচ্ছ করবেন না।

জয় বাংলা।

One thought on “এক বশেমুরবিপ্রবি মেরুদন্ডহীন, আবার আরেক বশেমুরবিপ্রবির জন্ম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares